• সোমবার ৩রা আগস্ট, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ ১৯শে শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

    শিরোনাম

    হংকংয়ে করোনার তৃতীয় ঢেউ, বিশ্বকে কী বার্তা দিচ্ছে

    স্বপ্নচাষ ডেস্ক

    ০১ আগস্ট ২০২০ ৪:৩৫ পূর্বাহ্ণ

    হংকংয়ে করোনার তৃতীয় ঢেউ, বিশ্বকে কী বার্তা দিচ্ছে

    সংগৃহীত

    করোনাভাইরাস মহামারি মোকাবিলায় সফলতার জন্য হংকংকে কয়েকদিন আগেও ‘পোস্টার চাইল্ড’ হিসেবে মনে করা হতো।করোনার উৎপত্তিস্থল চীনের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সীমান্ত থাকা স্বত্ত্বেও হংকং ভাইরাসটিতে সংক্রমণের সংখ্যায় লাগাম টেনে রাখতে সক্ষম হয়েছিল। করোনা মোকাবিলায় চীনের কিছু অংশে, ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কঠোর লকডাউন ব্যবস্থা কার্যকর করা হলেও হংকংকে সেপথে হাঁটতে হয়নি।

    কিন্তু বর্তমানে চীনের বিশেষ এই অঞ্চল দ্বিতীয় নয়, বরং করোনার প্রাদুর্ভাবের ‘তৃতীয় ঢেউয়ের’ মুখোমুখি হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় রেকর্ড সর্বোচ্চ সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার পর হংকং সরকার সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, এভাবে চলতে থাকলে চিকিৎসা ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে।

    হঠাৎ করে হংকং কি এমন ভুল করে বসল যে দেশটি এখন সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিতে বাধ্য হলো। মহামারি এবং লকডাউনের কারণে বিপর্যস্ত অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য কি বার্তা দিচ্ছে হংকং।

    কোয়ারেন্টাইনে ছাড় এবং প্রাচীরেই ফুটো

    হংকংয়ে প্রথম করোনা সংক্রমণ শনাক্ত হয় জানুয়ারির শেষের দিকে। সেই সময় সেখানকার বাসিন্দারা ব্যাপক আতঙ্ক-উদ্বেগ নিয়ে প্রচুর কেনাকাটা করেন। আতঙ্কিত লোকজন ঘরে বন্দিদশা কাটাতে থাকেন। সংক্রমণের সংখ্যা ছিল তুলনামূলক কম এবং খুব দ্রুততার সঙ্গে এর বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়।

    বিদেশে থাকা বাসিন্দা এবং শিক্ষার্থীরা ফিরতে শুরু করায় স্বায়ত্ত্বশাসিত এই অঞ্চলে করোনার ‘দ্বিতীয় ঢেউ’ দেখা যায় মার্চে। সেই সময় বিদেশ ফেরতদের অনেকের মাঝে করোনা শনাক্ত হয়।

    এর ফলে কঠোর সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের পথে হাঁটতে বাধ্য হয় হংকং। কোনও বিদেশি ঢুকতে পারবেন না বলে জানিয়ে দেয়া হয়। তবে যারা সেখানকার বাসিন্দা এবং বিদেশ থেকে ফিরে আসেন; তাদের কোভিড-১৯ পরীক্ষা এবং ১৪ দিনের বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টাইন পালনের নির্দেশ দেয়া হয়।

    নতুন আগতদের শনাক্ত করতে ইলেক্ট্রনিক ব্রেসলাইট ব্যবহার করে তারা বাড়িতে অবস্থান করছেন কিনা তা নিশ্চিত করা হয়। এর পাশাপাশি ব্যাপকভাবে মাস্কের ব্যবহার এবং সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিতের ফলে স্থানীয়ভাবে সংক্রমণ প্রায় নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয় হংকং। সেই সময় মনে হচ্ছিল- হংকংয়ের বাসিন্দাদের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক হতে যাচ্ছে।

    তাহলে হংকংয়ে কীভাবে ‘তৃতীয় ঢেউ’ আছড়ে পড়ল- যে গত টানা দশ দিন ধরে সেখানে গড়ে শতাধিক কোভিড-১৯ রোগী শনাক্ত হচ্ছেন?

    ‘ব্যাপক প্রাদুর্ভাবের দ্বারপ্রান্তে হংকং’

    ইউনিভার্সিটি অফ হংকংয়ের ভাইরোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান মালিক পেইরিস বলেন, এটা বেশ হতাশাজনক। কারণ হংকং সত্যিই করোনা মহামারি অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আনতে পেরেছিল।

    তার মতে- করোনা মহামারি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় হংকংয়ের দু’টি ত্রুটি ছিল। প্রথমত- বিদেশ ফেরত অনেকেই সরকারি কোয়ারেন্টাইন শিবিরে না গিয়ে ১৪ দিনের কোয়ারেন্টােইন বাড়িতে পালনের সুযোগ পেয়েছিলেন। যা যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের অনেক দেশেই করা হচ্ছে।

    অধ্যাপক পেরিস বলেন, সেখানে আরেকটি দুর্বলতা ছিল। কারণ বাড়িতে যারা আগে থেকে ছিলেন, তারা কোনও ধরনের বিধি-নিষেধ পালন করেননি; তারা বাড়ির বাইরে হর-হামেশাই আসা-যাওয়া করতেন।

    তবে সবচেয়ে গুরুতর সমস্যাটি তখন তৈরি হয়েছে, যখন হংকংয়ে প্রবেশকারী বেশ কয়েকটি শ্রেণির লোকজনকে পরীক্ষা এবং কোয়ারেন্টাইন পালনের তালিকা থেকে বাদ দিয়ে দেয় সরকার। সমুদ্রযাত্রী, এয়ার ক্রু ও স্টক এক্সচেঞ্জের তালিকাভূক্ত বিভিন্ন কোম্পানির নির্বাহীরা-সহ প্রায় ২ লাখ মানুষ কোয়ারেন্টাইন পালনের তালিকা থেকে অব্যাহতি পান।

    হংকংয়ের প্রাত্যহিক কার্যক্রম স্বাভাবিকের বিষয়টি নিশ্চিত করতে তারা অব্যাহতি পান বলে জানায় সরকার। শুধু তাই নয়, সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, শহরের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য তাদের ভ্রমণ জরুরি।

    আন্তর্জাতিক পরিবহনের অন্যতম এই কেন্দ্র এবং বাণিজ্যিক বন্দরের সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিমান চলাচল চালু রয়েছে। অনেক জাহাজ সেখানে পৌঁছে ক্রু পরিবর্তন করে। খাবার এবং অন্যান্য নিত্য-প্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী আমদানির জন্য মূল ভূখণ্ড চীন এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ওপর নির্ভরশীল হংকং।

    বিশ্বের জন্য সতর্কবার্তা

    কোয়ারেন্টাইন পালনের তালিকা থেকে এই অব্যাহতি দেয়ার বিষয়টিকে বড় ধরনের ছিদ্র বলে মন্তব্য করেন হংকংয়ের সংক্রামক ব্যাধি বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসক জোসেফ স্যাং। তার মতে- সমুদ্রযাত্রী এবং এয়ার ক্রুরাই সংক্রমণ বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি করে। কারণ তারা সেখানকার পর্যটন কেন্দ্র পরিদর্শন এবং গণপরিবহন ব্যবহার করেন।

    প্রথম দিকে হংকংয়ের সরকার কোয়ারেন্টাইনে অব্যাহতির বিষয়টি নিয়ে দোষারোপ করা উচিত নয় বলে জানায়। কিন্তু পরবর্তীতে সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাবের পেছনে কোয়ারেন্টাইন অব্যাহতির ভূমিকা আছে বলে প্রমাণ পাওয়ার তথ্য স্বীকার করে সরকার। তারা এখন আকাশ ও সমুদ্রপথে ব্যাপক কড়াকড়ি আরোপ করেছে। যদিও তা বাস্তবায়ন করা কঠিন হতে পারে।

    ইউনিভার্সিটি অফ হংকংয়ের ইপিডেমিওলজির অধ্যাপক বেঞ্জামিন কাউলিং বলেন, হংকং কোয়ারেন্টাইন সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে। একই ধরনের সমস্যা অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রেও হতে পারে। যুক্তরাজ্যে বাড়িতে ১৪ দিনের কোয়ারেন্টাইন পালন করতে হয়। যে কারণে সেখানেও একই ধরনের লিকেজের সম্ভাবনা রয়েছে।

    তিনি বলেন, অন্যদিকে- নিউজিল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়ায় হোটেলে বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টাইন পালনের ব্যবস্থা রয়েছে। যদিও হোটেলে থাকার অর্থ কে পরিশোধ করবে তা নিয়ে সমস্যা রয়েছে। তারপরও এটি একটি ভালো ধারণা।

    সামাজিক দূরত্ব বিধি প্রত্যাহারে বিপদ

    হংকংয়ে গত কয়েক মাস ধরেই কোয়ারেন্টাইন অব্যাহতি চালু ছিল। কিন্তু সেখানে করোনা সংক্রমণের ‘তৃতীয় ঢেউ’ শুরু হয়েছে জুলাইয়ে। অধ্যাপক পেরিসের ধারণা দ্বিতীয় কারণটির জন্য জুনের দিকে আবারও হংকংয়ে সামাজিক দূরত্বের বিধান ফিরিয়ে আনা হয়।

    তিনি বলেন, সামাজিক দূরত্ব বিধি যতক্ষণ পর্যন্ত কার্যকর থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত করোনার সঙ্গে পেরে ওঠা যাবে। কিন্তু একবার শিথিল করা হলে সেখানে বিদেশ ফেরতদের মাধ্যমে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে। এটি প্রত্যেকের জন্য একটি শিক্ষা।

    হংকংয়ে করোনা পরিস্থিতির বর্তমান অবস্থা

    চীনের বিশেষ এই অঞ্চলে গত টানা ১০ দিন ধরে গড়ে ১০০ জনের বেশি মানুষের করোনা শনাক্ত হয়েছে। যদিও হংকংয়ের মোট করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক কম। হংকং করোনাভাইরাস মহামারির লাগাম টেনে সফলতার উদাহরণ তৈরি করছে বলে যখন মনে করা হচ্ছিল ঠিক তখনই নতুন করে সংক্রমণ বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে।

    কয়েক সপ্তাহ আগেও সেখানে স্থানীয় কোনও সংক্রমণ ছিল না। কিন্তু বর্তমানে দেশটিতে করোনার তৃতীয় ঢেউয়ের মুখোমুখি হয়েছে। বুধবার হংকংয়ের প্রধান নির্বাহী ক্যারি লাম বলেছিলেন, বড় ধরনের প্রাদুর্ভাবের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে হংকং; যা এই অঞ্চলের চিকিৎসা ব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলতে পারে। হংকংয়ে এখন পর্যন্ত ৩ হাজার ২০০ জনের বেশি মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন এবং মারা গেছেন ২৭ জন।

    সেপ্টেম্বরের নির্বাচনের কি হবে?

    করোনাভাইরাসের সংক্রমণ তীব্র হওয়ায় হংকংয়ের পার্লামেন্টের নির্বাচন আগামী এক বছরের জন্য পিছিয়ে দেয়া হয়েছে। শুক্রবার করোনা মহামারি মোকাবিলায় নির্বাচন পেছানোর প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে জানিয়েছে এই অঞ্চলের সরকার।
    এদিকে, জনগণকে ভোটদানে বাধা দেয়ার জন্য সরকার মহামারিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ তুলেছেন বিরোধীরা। হংকংয়ে নিবন্ধিত ভোটার রয়েছে ৪৪ লাখ।

    এর আগে, বৃহস্পতিবার হংকংয়ের সরকার গণতন্ত্রপন্থী ১২ প্রার্থীর আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। বেইজিংয়ের আরোপিত বিতর্কিত জাতীয় নিরাপত্তা আইনের কারণে তৈরি হওয়া ক্ষোভকে পুঁজি করে আগামী সেপ্টেম্বরের আইন পরিষদের নির্বাচনে বিরোধীরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার আশা করছেন।

    হংকংয়ের স্বাধীনতা খর্ব করতে নতুন নিরাপত্তা আইন জারি করা হয়েছে উল্লেখ করে এর তীব্র বিরোধিতা করে আসছেন গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনকারীরা। গত বছরের জেলা পরিষদ নির্বাচনে নজিরবিহীন জয় পায় গণতন্ত্রপন্থী প্রার্থীরা; পরিষদের ১৮ টি আসনের ১৭টিতেই জয় পান তারা।

    আগামী নির্বাচন স্থগিত করতে জরুরি ক্ষমতা প্রয়োগের কথা জানিয়েছেন ক্যারি লাম। তিনি বলেছেন, আমি গত সাত মাসে যত সিদ্ধান্ত নিয়েছি, তারমধ্যে এটাই ছিল সবচেয়ে কঠিন।

    ক্যারি লাম বলেন, পুরোপুরি জননিরাপত্তার স্বার্থে নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে। এর পেছনে কোনও ধরনের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নেই। সামাজিক দূরত্ব মানা এবং প্রচার চালানো ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে বিবেচনায় নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

    সূত্র: বিবিসি

    স্বপ্নচাষ/আরটি

    Facebook Comments

    বাংলাদেশ সময়: ৪:৩৫ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ০১ আগস্ট ২০২০

    swapnochash.com |

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
    ১০১১১২১৩১৪
    ১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
    ২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
    ২৯৩০৩১  

    সম্পাদক : এনায়েত করিম

    সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: গুরুদাসপুর, নাটোর-৬৪৩০
    ফোন : ০১৫৫৮১৪৫৫২৪ email : swapnochash@gmail.com

    ©- 2020 স্বপ্নচাষ.কম কর্তৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত।